কারবালার হৃদয় বিদারক ইতিহাস-৬
হযরত আব্দুল্লাহ বিন হাসান রহমতুল্লাহি
আলাইহি-এর শাহাদাত
হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার
সামনে তাঁর আপন ভাতিজা, হযরত ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু
তায়ালা আনহু উনার নয়নের মণি এবং হযরত ফাতিমাতুয্ যাহ্রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা
আনহা ও হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার
দৌহিত্র উপস্থিত হলেন। তিনি জিহাদে গমনের জন্য অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তিনি যখন
অনুমতি প্রার্থনা করলেন তখন হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার ভাতিজার প্রতি
অশ্রুসজল নয়নে তাকালেন এবং বললেন, ‘তোমরা আমার সাথে
এসেছিলে, চাচার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় উনার ভক্ত ও
মুরীদানদের বাড়িতে যাবে এবং কিছুদিন আনন্দ-ইত্মিনানে দিন অতিবাহিত করবে। আর আমিও
তোমাদেরকে তলোয়ার ও তীরের আঘাত খাওয়ার জন্য সঙ্গে আনিনি। শোন! ওরা আমার রক্তের
পিপাসু, তোমাদের রক্তের জন্য লালায়িত নয়। সুতরাং,
তোমাকে আমি অনুমতি দিতে পারিনা। তুমি আশ্রয় শিবিরে চলে যাও এবং
তোমার মা-বোনদের সাথে মদীনা মুনাওওয়ারায় চলে যেও। কিন্তু ভাতিজা বার বার বলতে
লাগলেন, চাচাজান! আমাকে আপনার হাতে বিদায় দিন এবং আপনার
বর্তমানেই জিহাদের ময়দানে যাওয়ার অনুমতি দিন। আমিও জান্নাতুল ফিরদাউসে পৌঁছার
জন্য অস্থির। চাচাজান! দীর্ঘ তিন দিনের পিপাসায় খুবই কষ্ট পেয়েছি। এখন মন চাচ্ছে
যে, যত তাড়াতাড়ি পারি জান্নাতুল ফিরদাউসে পৌঁছে আপন
পিতা ও দাদাজানের হাত মুবারকে কাওছারের পানি পান করে তৃষ্ণা নিবারণ করি। ভাতিজার
জান-কুরবানীর জন্য এ রকম দৃঢ় সংকল্প বোধ দেখে উনাকে ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু
তায়ালা আনহু নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলেন; এরপর
অশ্রুসজল নয়নে অনুমতি দিলেন।
হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজ্হাহু
রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার দৌহিত্র, হযরত ইমাম হাসান
রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার নয়নমণি হযরত আব্দুল্লাহ বিন হাসান
রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু কারবালার মাঠে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মত চমকাতে লাগলেন
এবং ইয়াযীদী বাহিনীর সাথে মোকাবিলা করে অনেক ইয়াযীদী সৈন্যকে জাহান্নামে নিক্ষেপ
করে নিজে আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে শেষ পর্যন্ত শাহাদাত বরণ করেন।
হযরত ইমাম ক্বাসিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর
শাহাদাত
এবার হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার
সামনে যিনি এসে উপস্থিত, উনি হলেন উনার প্রিয়
ভাতিজা হযরত ক্বাসিম রহমতুল্লাহি আলাইহি। যাঁর সাথে উনার মেয়ে হযরত সখিনা আলাইহাস
সালাম উনার বিবাহের আগাম ওয়াদা ছিল। হযরত ক্বাসিম রহমতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন ঊনিশ
বছরের নওজোয়ান। যখন উনি উনার নওজোয়ান ভাতিজাকে সামনে দেখলেন, তখন তিনি কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, বাবা! আমি
তোমাকে কিভাবে বিদায় দিতে পারি? তোমাকে কি আমি
তীর-তলোয়ারের আঘাত খাওয়ার অনুমতি দিতে পারি? প্রিয়
ভাতিজা! দেখ, আমার ভাইয়ের এটা একান্ত আশা ছিল যে,
সখিনার বিবাহ যেন তোমার সাথে হয়। শোন ভাতিজা! তুমি মদীনা
মুনাওওয়ারায় ফিরে গিয়ে আমার মেয়ে সখিনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আমার
ভাইয়ের আশা পূর্ণ করো। কিন্তু হযরত ক্বাসিম রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, চাচাজান! আমার আব্বাজানের আরও একটি আশা ছিল, সেটা
হলো, আমার আব্বাজান আমার গলায় একটা তাবিজ দিয়েছিলেন এবং
ওসীয়ত করে গিয়েছেন যে, ‘বাবা! এ তাবিজটা তখনই খুলে দেখো,
যখন কোন বড় মুছীবতের সম্মুখীন হও এবং সেই মুতাবিক আমল করো।’
তাই আমি এ মুহূর্তে তাবিজটা খুলে দেখলাম। কারণ এর থেকে বড়
মুছীবত আর কী হতে পারে! তাবিজ খুলে যা লিখা দেখলাম তাহলো- ‘ওহে আমার প্রিয় বৎস ক্বাসিম! এমন এক সময় আসবে, যখন আমার ভাই কারবালার মাঠে শত্রু পরিবেষ্টিত হবে। শত্রুরা উনার জানের
পিপাসু হবে, বৎস! তুমি যদি সত্যিকার আমার ছেলে হও,
তখন নিজ জানের কোন পরওয়া করো না। বরং নিজের জান চাচা’র জন্য উৎসর্গ করে দিও। কারণ, সেই সময় আমার
ভাই হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার জন্য যে জান কুরবানী দেবে, আল্লাহ তায়ালার দরবারে সে খুবই উচ্চ মর্যাদা লাভ করবে।’ তাই চাচাজান! আমাকেও আপনার হাতে বিদায় দিন। আমি আপনার পরে জীবিত থাকতে
চাই না। আমাকে বিদায় দিন, আমি যাতে সহসা জান্নাতুল
ফিরদাউসে পৌঁছে তৃষ্ণা নিবারণ করতে পারি এবং আব্বাজানকে গিয়ে বলতে পারি, আব্বাজান! আমি আপনার ওসীয়ত পূর্ণ করে এসেছি।’
হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম শেষ
পর্যন্ত উনাকেও বুকে জড়িয়ে ধরে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে বিদায় দিলেন। হযরত ইমাম
ক্বাসিম রহমতুল্লাহি আলাইহি ইয়াযীদী বাহিনীর বড় বড় যোদ্ধাকে টুকরো-টুকরো করে
ফেলতে লাগলেন। ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে যে বীরত্ব
দেখান, তা দেখে ইয়াযীদী বাহিনীর জাদরেল সৈন্যরাও হতভম্ব হয়ে
যায়। শেষ পর্যন্ত তিনিও আঘাতের পর আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে যান
এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে পৌঁছেন । এভাবেই হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার
চারজন ভাতিজা শহীদ হন।
ভাগিনাদ্বয়ের শাহাদাত
চার ভাতিজার শাহাদাতের পর হযরত ইমাম
হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার আপন বোন হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম উনার দুই অবুঝ
সন্তান হযরত মুহম্মদ এবং হযরত আউন রহমতুল্লাহি আলাইহিমাকে নিয়ে উনার সামনে
উপস্থিত হয়ে বললেন, ভাইজান! আপনার এ ভাগিনাদ্বয়ও আপনার
জন্য জান কুরবান করতে প্রস্তুত। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বললেন, বোন! এদেরকে তীরের আঘাত খাওয়ার জন্য সাথে আনা হয়নি। আমার সামনে
তাঁদেরকে বর্শার অগ্রভাগে ঝুলানো হবে, তা আমার সহ্য হবে
না। তুমি তাঁদেরকে নিয়ে যাও এবং আশ্রয় শিবিরে গিয়ে অবস্থান করো।’ বোন বললেন, ভাইজান! কখনো তা হতে পারে না,
আমি চাই আমার সন্তানদ্বয় আপনার জন্য কুরবান হোক। আমি যেন
জান্নাতুল ফিরদাউসে গিয়ে আমার আব্বাজানকে বলতে পারি, আমার
দু’টি ছেলেকেও আপনার সন্তানের জন্য কুরবানী দিয়েছি। তাই
আপনি এদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরুন এবং বিদায় দিন।
বোনের বার বার আকুতি-মিনতির কারণে উনি
তাঁদেরকেও যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠালেন। হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম উনার নয়নমণি ও জানের
জান সন্তানদের প্রতি নিজের অগাধ মায়া-মমতাকে বিসর্জন দিয়ে সন্তানদ্বয়কে বিদায়
দিলেন। এ কঁচি ছেলেদ্বয় বেশি দূর অগ্রসর হতে পারলেন না। ইয়াযীদী বাহিনীর
যালিমেরা এসে তাঁদেরকে বর্শার অগ্রভাগে উঠিয়ে নিল।
হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম এ দৃশ্য
দেখে দৌঁড়ে গেলেন এবং ভাগিনাদ্বয়ের মুবারক লাশ কাঁধে নিয়ে আশ্রয় শিবিরের কাছে
এনে রাখলেন এবং বোনকে সম্বোধন করে বললেন, ওহে বোন! তোমার আরজু
পূরণ হলো। তোমার সন্তানদ্বয় জান্নাতুল ফিরদাউসে পৌঁছে তৃষ্ণা নিবারণ করছে। মা
শহীদ ছেলেদ্বয়ের পাশে দাঁড়িয়ে নীরবে চোখের পানি ফেললেন এবং ছেলেদের মাথার চুলে
আঙ্গুল বুলিয়ে বুলিয়ে বললেন, বাবারা! তোমাদের প্রতি
তোমাদের মা খুবই সন্তুষ্ট। তোমরা তোমাদের মামার জন্য জান-কুরবান করেছ এবং
জান্নাতুল ফিরদাউসে পৌঁছে গেছ।
হযরত আব্বাস আলাইহিস সালাম-এর শাহাদাত
হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বোনের হাত
ধরে জোর করে বোনকে নিয়ে তাঁবুতে প্রবেশ করলেন। সেখানে গিয়ে আর এক দৃশ্য দেখলেন, উনার ছয় মাসের দুগ্ধ পোষ্য সন্তান হযরত আলী আছগর আলাইহিস সালাম
তৃষ্ণায় ছটফট করছেন এবং উনার জিহ্বা মুবারক বের হয়ে গেছে। ছেলের মা বললেন,
বাচ্চার এই অবস্থা আমি আর সহ্য করতে পারছি না। মুখ দিয়ে তাঁর
কোন আওয়াজ বের হচ্ছে না। যে কোন প্রকারে তাঁর জন্য একটু পানি সংগ্রহ করুন। হযরত
আব্বাস আলাইহিস সালাম পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি এ কথা শুনে একেবারে ব্যাকুল হয়ে
পড়লেন এবং বললেন, ভাইজান! আমাকে অনুমতি দিন, আমি এই মুহূর্তে গিয়ে ফোরাত নদী থেকে পানি নিয়ে এসে এ বাচ্চার তৃষ্ণা
নিবারণ করি। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বললেন, ভাই!
একটু সবর করো, সে জান্নাতুল ফিরদাউসে গিয়ে তৃষ্ণা নিবারণ
করবে। কিন্তু হযরত আব্বাস আলাইহিস সালাম বললেন, ভাই! বড়
পরিতাপের বিষয়। আমাদের সামনে একটি মাছূম শিশু এভাবে তৃষ্ণা-কাতর হয়ে থাকবে,
তা কখনো হতে পারে না। আমরা কী সেই শেরে খোদার আওলাদ নই, যিনি খায়বারের বৃহৎ দরজা হাতের উপর তুলে নিয়েছিলেন? আমি কোন বাধা মানতে রাজী নই, এ মুহূর্তে পানি
নিয়ে এসে এ মাছূম বাচ্চার তৃষ্ণা মিটাবো।
অতঃপর মশক নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে তিনি ফোরাত
নদীর দিকে ধাবিত হলেন এবং ফোরাত নদীর কাছে গিয়ে অতিদ্রুত ঘোড়া থেকে অবতরণ করে
মশক ভরে পানি নিলেন এবং মুখ বন্ধ করে কাঁধের উপর উঠালেন এবং নিজ হাতে এক অঞ্জলি
পানি মুখের কাছে নিলেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে তৃষ্ণার্ত ভাতিজার কথা মনে উদিত হলো।
ভাতিজা যেন বললো, ‘চাচাজান! আপনার উচিত নয় যে,
আমার আগে পানি পান করা। আপনি আলী আছগরের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য
পানি নিতে এসেছেন, নিজের জন্য নয়। প্রথমে আপনার মাছূম
ভাতিজার তৃষ্ণা নিবারণ করুন। এর পরেই আপনি পান করুন।’ শেষ
পর্যন্ত হাতে নেয়া পানি তিনি ফেলে দিলেন এবং ঘোড়াকে নদীর কিনারা থেকে উঠালেন,
তখন ইয়াযীদের যালিম বাহিনীরা উনাকে ঘিরে ফেলল। তিনি এ অবরোধ ভেদ
করে অগ্রসর হলেন। ওরা পুনরায় অবরোধ করলো। তিনি সেটাও প্রতিহত করলেন। এভাবে অবরোধ
প্রতিহত করে ইয়াযীদী বাহিনীর অনেককেই জাহান্নামে পাঠিয়ে তিনি অগ্রসর হচ্ছিলেন
কিন্তু তিনি ছিলেন একা। আর ওরা ছিল চার হাজারেরও অধিক। ওরা পুনরায় চারিদিক থেকে
ঘিরে বৃষ্টির মত তীর নিক্ষেপ করে তাঁর শরীর ঝাঁঝরা করে দেয়। এভাবে তীরের আঘাতে
যখন তাঁর শরীর মুবারক থেকে অনেক রক্ত বের হয়ে গেল, কাপুরুষ
ইয়াযীদ বাহিনীরা বুঝতে পারলো যে, তিনি অনেক কাবু হয়ে
গেছেন। তাই নিকটবর্তী হয়ে পিছন দিক থেকে একজন তরবারী দিয়ে আঘাত করে তাঁর বাম হাত
কেটে ফেলল। বাম হাত কেটে ফেলায় মশক পড়ে যাচ্ছিল। শেরে খোদার আওলাদ তখনও সাহস
হারাননি। তিনি মশক ডান কাঁধে নিয়ে নিলেন। সেই যালিমরা ডান হাতটাও কেটে ফেলে। মশক
তখন পড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু শেরে খোদার আওলাদ-এর হিম্মত দেখুন, তিনি দুই বাজু দিয়ে মশক আঁকড়িয়ে ধরলেন। এবার বাজুদ্বয়ও কেটে ফেলে
কাফিররা। এখন কোন হাত নেই যে ঘোড়ার লাগাম ধরবেন, এমন কোন
হাত নেই যে তলোয়ার চালনা করবেন, এমন কিছু নেই যে মশক
আঁকড়িয়ে ধরবেন।
শেষ পর্যন্ত তিনি দাঁত দিয়ে মশকের মুখ
কামড়িয়ে ধরলেন। যালিমরা তীর নিক্ষেপ করে মশক
ফুটা করে দিল এবং পানি সব পড়ে গেল। এই অবস্থা দেখে তিনি দাঁতের কামড় থেকে মশক
ছেড়ে দিয়ে বলতে লাগলেন, হে আলী আছগর! আলাইহিস
সালাম এই অবস্থায় আমি কিভাবে তোমার তৃষ্ণা নিবারণ করি? আমিতো
তোমার তৃষ্ণা নিবারণে কামিয়াব হতে পারলাম না। বাবা! এখন তোমার চাচার কেমন অবস্থা হয়েছে দেখ। তিনি ঘোড়ার উপর বসা অবস্থায়
ছিলেন। ইয়াযীদী বাহিনীর সৈন্যরা তীরের আঘাতে উনাকে ঘোড়া থেকে মাটিতে ফেলে দিল
এবং চারিদিক থেকে তলোয়ার দ্বারা আঘাত করতে লাগলো। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম
দূর থেকে দেখলেন হযরত আব্বাস আলাইহিস সালাম ঘোড়া থেকে মাটিতে পড়ে গেছেন। তখন উনি
গুমরিয়ে কেঁদে উঠলেন এবং বললেন, ‘আমার কোমর ভেঙ্গে
গেল।’ উনি একেবারে বেকারার হয়ে পড়লেন। উনার সকল সঙ্গী
শহীদ হয়ে গেলেন এবং উনার ডান হাত হযরত আব্বাস আলাইহিস সালাম আলাইহিও শহীদ হয়ে
গেলেন। এমতাবস্থায় হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম একেবারে একা হয়ে গেলেন। উনি
আত্মহারা হয়ে উনার শহীদ ভাইয়ের নিথর দেহের কাছে ছুটে গেলেন। হযরত আব্বাস আলাইহিস
সালাম আলাইহি-এর দুই বাহু কাটা ছিল, শরীর ঠা-া হয়ে
গিয়েছিল এবং সেই যালিমরা তাঁর মাথা কেটে নিয়ে গিয়েছিল। লাশের কাছে পৌঁছে তিনি
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন এবং বলতে লাগলেন, ভাই!
তুমিতো আমাকে ছেড়ে চলে গেলে, তোমার সাথে অনেক কথা বলার
ছিল। কিন্তু কিছুই বলতে পারলাম না।’ অতঃপর ভাইয়ের রক্তে
রঞ্জিত নিথর দেহ সেখানে রেখেই কাঁদতে কাঁদতে ফিরে এলেন।
হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম -এর শাহাদাত
হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম হযরত
আব্বাস আলাইহিস সালাম আলাইহি-এর শহীদী দেহ মুবারকের কাছ থেকে ফিরে এসে দেখলেন, উনার আঠারো বছরের ছেলে হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম উনি জিহাদে যাওয়ার
জন্য প্রস্তুত হয়ে আছেন এবং হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে বললেন, আব্বাজান! আমাকেও বিদায় দিন। আমি চাই না, আপনার
পর জীবিত থাকতে। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বললেন, বাবা
শোন! তুমিতো আমার নানাজান মুস্তফা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারই
প্রতিচ্ছবি, হুবহু নক্্শা। তোমাকে যখন কেউ দেখে, দিলের তৃষ্ণা মিটে যায়। তোমাকে দেখলেই আমার নানাজান ছল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক আকৃতি মুবারক সামনে ভেসে ওঠে। তোমাকে যদি আজ
বিদায় দিই, আমাদের ঘর থেকে আমার নানাজান ছল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতিচ্ছবি চলে যাবে। বাবা! তুমি যেয়ো না। ওরা আমারই
রক্তের পিপাসু। আমার রক্তের দ্বারাই ওদের পিপাসা নিবারণ হবে। কিন্তু হযরত আলী আকবর
আলাইহিস সালাম বললেন, আব্বাজান! আমিও ওখানে যেতে চাই
যেখানে আমার ভাই ক্বাসিম গেছেন, যেখানে আমার চাচাজান
গেছেন। আমি কাপুরুষের মত পিছনে পড়ে থাকতে চাই না। আমিও জান্নাতুল ফিরদাউসে গিয়ে
তৃষ্ণা নিবারণের জন্য ব্যাকুল। আমাকেও আপনার হাতে বিদায় দিন। আমাকে যালিমদের হাতে
সোপর্দ করে যাবেন না। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বাধ্য হয়ে তাঁর আঠারো বছরের
ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন এবং বিদায় দিলেন।
হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম রওয়ানা
হলেন। আল্লাহু আকবর! ইনি কে যাচ্ছেন? সরকারে দো-আলম,
নূরে মুজাস্্সাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার
প্রতিচ্ছবি হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার জানের জান যাচ্ছেন। হযরত
ফাতিমাতুয্ যাহরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর বাগানের ফুল যাচ্ছেন। ইনি হুযূর
পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বাগানের ফুলের কলি যাচ্ছেন। হযরত আলী
আকবর আলাইহিস সালাম যেতে যেতে এটা পড়তে ছিলেন-
انا على بن الحسين بن على + نحن اهل البيت اولى بالنبى.
‘আনা আলিই-ইব্নুল হুসাইনিব্নু
আলিইয়ি-নাহ্নু আহ্্লুল বাইতি আওলা বিন্নাবিইয়ি’ অর্থাৎ-
‘আমি আলী আকবর, হযরত হুসাইন
রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার ছেলে, যে হুসাইন
রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজ্হাহু রদ্বিয়াল্লাহু
তায়ালা আনহু উনার বংশধর। আমরাই হলাম আহলে বাইত, রসূল
ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সবচেয়ে প্রিয় বংশধর।’ এ ‘শে’র’ পড়তে পড়তে ইমাম আলী আকবর আলাইহিস সালাম সামনে অগ্রসর হলেন এবং
ইয়াযীদী বাহিনীর সামনে গিয়ে বললেন, আমার দিকে লক্ষ্য
করো! আমি ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার সন্তান। আলী আকবর আমার
নাম। হে নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ঘরকে উজাড়কারী! হযরত
ফাতিমাতুয্ যাহ্রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর বাগানের ফুল ও কলিসমূহকে
কারবালার উত্তপ্ত বালিতে ছিন্ন-ভিন্নকারীরা! আমার রক্ত দ্বারাও তোমাদের হাতকে
রঞ্জিত করো, আমার প্রতিও তীর নিক্ষেপ করো।’ হযরত ইমাম আলী আকবর আলাইহিস সালাম বলছেন, যালিমদের
সাহস নেই, এ নওজোয়ানের প্রতি তীর নিক্ষেপ করার বা তরবারী
চালানোর। আমর বিন সাআদ নিজ সৈন্যদেরকে বলল, হে কাপুরুষের
দল! তোমাদের কি হলো? সত্ত্বর একেও বর্শায় উঠিয়ে নাও।
আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, যে সকলের আগে এ নওজোয়ানকে কতল করতে পারবে, আমি
তাকে ‘মোছিল’-এর রাজত্ব প্রদান
করবো। এমন কোন ব্যক্তি আছে কি? যে মোছিলের শাসক হতে চায়?
মোছিলের রাজত্ব পেতে চায়?
তারিক বিন শিশ্ নামক এক বদবখ্্ত পালোয়ান
ছিল। ওর মনে আমরের কথায় প্রভাব সৃষ্টি করল এবং সে আগে বাড়ল, দেখি ভাগ্যে মোছিলের গভর্নরগিরি আছে কিনা। সে তীর হাতে নিয়ে হযরত ইমাম
আলী আকবর আলাইহিস সালাম আলাইহিকে লক্ষ্য করে এগিয়ে গেল। হযরত আলী আকবর আলাইহিস
সালাম দৃঢ় স্তম্ভের মত দাঁড়িয়ে রইলেন। যখনই সে কাছে আসলো, হযরত আলী আকবর রহতুল্লাহি আলাইহি ঘোড়াকে ফিরায়ে ওর পিছনে এসে গেলেন
এবং এমন জোরে আঘাত হানলেন যে একপলকে ওর মাথাকে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলেন।
এই দৃশ্য দেখে ওর ছেলে উমর বিন তারিক রাগে
প্রজ্জ্বলিত হয়ে তলোয়ার উচু করে এগিয়ে আসলো। যখন উভয়ের তলোয়ার একটার সাথে আর
একটা আঘাতে ঝনঝনিয়ে উঠল, তখন যারা অবলোকন করেছে
তারা দেখছিল, ওর লাশ মাটিতে পড়ে ছটফট করছে। দ্বিতীয়
পুত্র তল্হা বিন তারেক সেও বাপ-ভাইয়ের খুনের বদলা নেয়ার জন্য অগ্নিশর্মা হয়ে
হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম উনার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। হযরত আলী আকবর আলাইহিস
সালাম একেও জাহান্নামে পাঠিয়ে দিলেন। এ তিনজনকে হত্যা করার পর হযরত ইমাম আলী আকবর
আলাইহিস সালাম ঘোড়া ফিরিয়ে তাঁর আব্বাজানের খিদমতে হাজির হলেন।
হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম দেখলেন, তাঁর কলিজার টুকরা জিহাদের ময়দান থেকে আসছেন। তিনি এগিয়ে এলেন,
এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, বাবা কি
খবর! হযরত ইমাম আলী আকবর আলাইহিস সালাম ঘোড়া থেকে অবতরণ করে আব্বাজানের কাছে আরজি
পেশ করলেন। আব্বাজান! তৃষ্ণা খুব কষ্ট দিচ্ছে। খুবই তৃষ্ণা অনুভব করছি। যদি এক
গ্লাস পানি পাওয়া যায়, তাহলে এদের সবাইকে জাহান্নামে
পাঠিয়ে দিতে পারবো ইনশাআল্লাহ। আব্বাজান! আমি ওদের তিন বদবখত্্ যোদ্ধাকে হত্যা
করে এসেছি, কিন্তু আমার মুখ শুকিয়ে গেছে, আমার গলাও শুকিয়ে গেছে, আমার নিশ্বাসটাও
সহজভাবে আসছে না। আমি খুবই কাহিল হয়ে গেছি।
হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বললেন, প্রিয় বৎস! ধৈর্য ধারণ কর। কিছুক্ষণের মধ্যেই তুমি জান্নাতুল ফিরদাউসে
পৌঁছে যাবে এবং হাউজে কাওছারের পানি দ্বারা তোমার তৃষ্ণা মিটাবে। কিন্তু বাবা!
তুমি যখন আমার কাছে এসেছ, এসো, হযরত
ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন এবং বললেন, মুখ খোল! হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম মুখ খুললেন এবং হযরত ইমাম হুসাইন
আলাইহিস সালাম উনার শুষ্ক জিহ্বা মুবারক ছেলের মুখের ভিতর প্রবেশ করিয়ে দিয়ে
বললেন, ‘আমার জিহ্বাটা চুষে নাও, হয়তো কিছুটা আরামবোধ করবে। হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম উনার
আব্বাজানের জিহ্বা চুষতে লাগলেন। জিহ্বা চুষে কিছুটা আরামবোধ করলেন।
এরপর হযরত ইমাম আলী আকবর আলাইহিস সালাম
পুনরায় জিহাদের ময়দানের দিকে এগিয়ে গেলেন। হযরত ইমাম আলী আকবর আলাইহিস সালাম
জিহাদের ময়দানে প্রমাণ করে দিয়েছেন, তিনি শেরে খোদার
দৌহিত্র। তাঁর শিরা-উপশিরায় হযরত আলী র্ক্রাামাল্লাহু ওয়াজ্হাহু রদ্বিয়াল্লাহু
তায়ালা আনহু উনার রক্ত মুবারক রয়েছে এবং তাঁর চোখে হযরত আলী র্ক্রাামাল্লাহু
ওয়াজ্্হাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার শক্তি কাজ করছে। তিনি আশি জন
ইয়াযীদী বাহিনীকে হত্যা করে নিজে আঘাতে জর্জরিত হয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে
শাহাদাত বরণ করার আগ মুহূর্তে ডাক দিয়ে বললেন- يا ابتاه ادركنى
‘ইয়া আবাতাহ! আদ্রিক্নী’ অর্থাৎ ‘ওহে আব্বাজান! আমাকে ধরুন, আমাকে নিয়ে যান,
আপনার আলী আকবর পড়ে যাচ্ছে।’ এ আহবান
শুনে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম দৌঁড়ে যান। তিনি ছেলের কাছে পৌঁছার আগে
যালিমরা হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম উনার শরীর মুবারক থেকে মাথা মুবারক বিচ্ছিন্ন
করে ফেলে। ছেলের শহীদী দেহের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি চোখের পানি ফেলছিলেন এবং অশ্রু
সজল নয়নে ছেলের শহীদী দেহ কাঁধে উঠিয়ে তাঁবুর পার্শে¦ নিয়ে
আসলেন। হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম উনার এ শাহাদাতে প্রত্যেকেই দারুণভাবে আঘাত
পেলেন। হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম তাঁবু থেকে বের হয়ে এসে হযরত ইমাম আলী আকবর
আলাইহিস সালাম আলাইহি-এর শহীদী দেহ মুবারক দেখে চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘আহ! যালিমরা প্রিয় নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার
প্রতিচ্ছবিকেও শেষ করে দিল।’
হযরত আলী আছগর আলাইহিস সালাম আলাইহি-এর
শাহাদাত
হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম ভাতিজা হযরত
আলী আকবর আলাইহিস সালাম উনার লাশের পাশে দাঁড়িয়ে অঝোর নয়নে কাঁদছিলেন।
হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বোনের হাত ধরে তাঁবুর
অভ্যন্তরে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘বোন! ছবর করো,
আল্লাহ তায়ালা ছবরকারীদের সাথে আছেন। ছবর এবং ধৈর্যের আঁচল
হাতছাড়া করো না। যা কিছু হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা’র পক্ষ থেকে হচ্ছে। আমাদের ছবর ও ধৈর্যের মাধ্যমে কামিয়াবী হাছিল করতে
হবে। এটা আল্লাহ তায়ালা’র পক্ষ থেকে মহাপরীক্ষা।’
বোনকে নিয়ে যখন তাঁবুর অভ্যন্তরে গেলেন, তখন হযরত শহরবানু আলাইহাস সালাম হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার
সামনে এসে বললেন, আপনার ছেলে আলী আছগর পানির তৃষ্ণায়
কেমন যেন করছে, গিয়ে দেখুন। পানির তৃষ্ণায় তাঁর অবস্থা
খুবই সঙ্গীন হয়ে গেছে। কোন রকম নড়াচড়া করতে পারছে না। কাঁদছেন কিন্তু চোখে পানি
আসছে না। মুখ হা করে আছেন, কোন আওয়াজ বেরুচ্ছে না।
অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে গেছে। শুনুন, যালিমেরা
হয়তো জানে না যে, আমাদের সাথে ছোট ছোট শিশুরাও রয়েছেন।
আমার মনে হয়, এ ছোট শিশুকে কোলে করে আপনি ওদের সামনে
নিয়ে গেলে নিশ্চয় ওদের দিলে রহম হতে পারে। কারণ এ রকম শিশু ওদের ঘরেও রয়েছে।
তাই আপনি এ শিশুকে কোলে করে ওদের সামনে নিয়ে যান এবং বলুন, আমাকে পানি দিও না, তোমাদের হাতে কয়েক ফোঁটা
পানি এ শিশুর মুখে দাও। তাহলে তারা নিশ্চয় দিবে। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম
বললেন, ‘শহরবানু! তোমার যদি এটা আরজু এবং ইচ্ছা হয়ে থাকে,
তাহলে তোমার এ ইচ্ছা পূর্ণ করতে আমি রাজি আছি। কিন্তু ঐ
বদবখ্তদের প্রতি আমার আদৌ আস্থা নেই।’
যা হোক, হযরত
ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম ছয় মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশুকে কোলে নিয়ে ইয়াযীদ
বাহিনীর সামনে গিয়ে বললেন, ‘দেখ! ইনি ছয় মাসের
দুগ্ধপোষ্য শিশু। ইনি আমার ছেলে আলী আছগর। ইনি তোমাদের সেই নবী করীম ছল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বংশধর, তোমরা যার কলিমা পাঠ
করো। শোন! আমি তোমাদের কোন ক্ষতি করে থাকলে, আমার থেকে
তোমরা এর বদলা নেবে। কিন্তু এ মাছূম শিশুতো তোমাদের কোন ক্ষতি করেননি। ইনি পানির
তৃষ্ণায় ছটফট করছেন, কিন্তু সেটা দেখা যাচ্ছে না। শোন!
আমার হাতে কোন পানির পেয়ালা দিও না, তোমাদের হাতে এ
শিশুর মুখে কয়েক ফোঁটা পানি দাও। আর এ শিশু পানি পান করার পর তৃষ্ণা মিটে গেলে
তলোয়ার হাতে নিয়ে তোমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন না। তাই উনার তৃষ্ণাটা নিবারণ করো।
তাঁবুর পর্দানশীন মহিলাদের কাকুতি-মিনতিতে টিকতে না পেরে আমি একে নিয়ে এসেছি।
হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম এ করুণ বর্ণনা দিচ্ছিলেন, আর এদিকে আলী আছগর আলাইহিস সালাম আলাইহিকে লক্ষ্য করে ‘হরমিলা বিন্্ কাহিল’ নামক এক বদবখ্্ত যালিম
তীর নিক্ষেপ করলো এবং সেই তীর এসে আলী আছগর আলাইহিস সালাম আলাইহি-এর গলায় বিধল।
হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম দেখলেন, শিশুটি একটু
গা-নাড়া দিয়ে চিরদিনের জন্য নিশ্চুপ হয়ে গেলেন।
হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম হুঁ হুঁ
করে কেঁদে উঠলেন, বলতে লাগলেন, ‘ওহে যালিমেরা! তোমরাতো তোমাদের নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম উনার প্রতিও কোন সমীহ করলে না। তোমাদের মনতো কাফিরদের থেকেও কঠোর। শিশুদের
প্রতি কাফিরেরাও সহানুভূতি দেখায়। তোমরাতো নিজেদেরকে মুসলমান বলে দাবি করো। এসব
কথা বলে তিনি ছেলের গলা থেকে তীর বের করলেন এবং নিথর দেহ মুবারক মাটিতে রেখে বললেন,
মাওলা! এ লোকেরা যা কিছু করছে, এর জন্য
আমি আপনাকে সাক্ষ্য করছি। দেহ মুবারক কাঁধে করে তাঁবুর কাছে নিয়ে এসে হযরত আলী
আকবর আলাইহিস সালাম উনার পাশে রেখে ডাক দিয়ে বললেন, ‘ওহে
শহরবানু! ওহে যয়নাব! আলী আছগর আর ছটফট করবেন না এবং তৃষ্ণার কারণে হাত পা
নড়াচড়া করবেন না। উনার তৃষ্ণার্ত অবস্থা থেকে তোমাদের অস্থিরতা আর বৃদ্ধি পাবে
না। সে জান্নাতুল ফিরদাউসে গিয়ে উনার দাদীজান আলাইহাস সালাম উনার কোলে বসে হাউজে
কাওছারের পানি পান করছেন।


No comments