সূরা বনী ইসরাইল উনার ১ নং আয়াত শরীফ উনার তাফসীর
سبحان الذى اسراى بعبده ليلامن المسجد الحرام الى
المسجد الاقصا الذى بباركنا حوله لنريه من ايا تنا انه هوالسميع البصير.
অনুবাদ: পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্বা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করায়েছিলেন, মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত। যার চারদিক আমি পর্যাপ্ত
বরকত দান করেছি, যাতে আমি উনাকে কুদরতের কিছু নিদর্শন
দেখিয়ে দেই। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা এবং সর্বদ্রষ্টা।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা : اسراى শব্দটি باب افعال -এর ওজনে اسراء
ক্রিয়ামূল থেকে উদ্ভূত। এর আভিধানিক অর্থ- রাত্রে নিয়ে যাওয়া।
পরবর্তী ليلا শব্দটি স্পষ্টতঃ এ অর্থই ফুটিয়ে তুলেছে। আর ليلا শব্দটি অনির্দিষ্ট ব্যবহার করে এদিকেও
ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, সমগ্র ঘটনায় সম্পূর্ণ
রাত্রি নয় বরং রাত্রির কিছু অংশ ব্যয়িত হয়েছে। আয়াত শরীফে উল্লেখিত المسجد الحرام বা কা’বা শরীফ থেকে المسجد الاقصا বা বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত সফরকে ইসরা
বলা হয় এবং সেখান থেকে উর্ধ্বলোকে যে সফর হয়েছে, তাকে বলা হয় معراج
মি’রাজ।
ইসরা অকাট্য পবিত্র আয়াত শরীফ দ্বারাই
প্রমাণিত হয়েছে, আর পবিত্র মি’রাজ শরীফ পবিত্র সূরা নজম
শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখিত রয়েছে এবং অনেক মুতাওয়াতির পবিত্র হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত।
হযরত নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
উনার পবিত্র হায়াত মুবারক উনার মধ্যে তাইয়্যেবায় সর্বমোট তেত্রিশবার পবিত্র মি’রাজ
শরীফ সংঘটিত হয়। তম্মধ্যে হিজরতের পূর্বে পবিত্র রজবুল হারাম মাস উনার ২৭ তারিখের রাত্রির
পবিত্র সফরই ছিল স্ব-শরীরে এবং জাগ্রত অবস্থায়।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ : সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক
ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র মক্কা শরীফ থেকে বোরাকে সওয়ার হয়ে পবিত্র
বাইতুল মুক্বাদ্দাস পৌঁছে ওযূঅন্তে দু’রাকায়াত নামায আদায় করেন। সেখানে পূর্বেকার
সকল হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামগণ উনারা উপস্থিত হয়ে উনার পিছনে ইক্তেদা করে নামায পড়েছিলেন। কার্যতঃ
এটা ছিল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক
ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নেতৃত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ।
তৎপর সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে সপ্তাকাশ পরিভ্রমণ করেন এবং প্রত্যেক আকাশে অবস্থানরত
পয়গম্বর আলাইহিস সালামগণ উনাদের সাক্ষাৎ ও পরিচয় গ্রহণ করেন। সপ্তাকাশে বাইতুল মা’মুর
মসজিদও দেখেন, যার দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে পবিত্র কা’বা
শরীফ উনার প্রতিষ্ঠাতা হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম তিনি উপবিষ্ট ছিলেন। অতঃপর তিনি
হযরত পয়গম্বর আলাইহিস সালামগণ উনাদের স্থান অতিক্রম করে এক ময়দানে পৌঁছেন, সেখানে ভাগ্যলিপি লেখার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তিনি সিদরাতুল মুন্তাহার
নিকট গেলেন, তথায় হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস সালাম উনাকে
স্ব-আকৃতিতে দেখেন। এরপর বেহেশত ও দোযখ পরিদর্শন করেন এবং সেখানে জান্নাতী এবং জাহান্নামীদের
অবস্থা অবলোকন করেন। তৎপর রফরফ বাহনে আরোহন পূর্বক মহান আল্লাহ পাক উনার নিকটবর্তী
হলেন। পবিত্র কুরআন শরীফ উনার ভাষায়-
ثم دنا فتدلى- فكان قاب قوسين او ادنى.
অর্থঃ- “তিনি ঝুঁকে পড়ে নিকটবর্তী হলেন, এমনকি ধনুকের দু’প্রান্তের যে ব্যবধান থাকে কিংবা তার চেয়েও
কম।”
অতঃপর সালাম বিনিময়ান্তে মহান আল্লাহ পাক তিনি স্বীয় হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ও উনার উম্মতগণ
উনাদের প্রতি নৈকট্য ও কল্যাণ হাসিলের নিমিত্তে প্রথমতঃ পঞ্চাশ ওয়াক্ত, পরে তা হ্রাস করে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ করে দেন। এ নামাযই উম্মতে
হাবীবী উনাদের জন্য পবিত্র মি’রাজ। সুবহানাল্লাহ! যেমন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে
উল্লেখ করা রয়েছে,
الصلواة معراج المؤمنين
অর্থঃ- “নামায মু’মিন উনাদেদের জন্য মি’রাজস্বরূপ।”
অতঃপর বাইতুল মুক্বাদ্দাস ফিরে আসেন এবং বিভিন্ন আকাশে অবস্থানরত হযরত পয়গম্বর
আলাইহিস সালামগণ উনারাও উনাকে বিদায় সম্বর্ধনা জানার জন্য বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত
আগমন করেন। কোন বর্ণনায় নামায পড়ার ঘটনাটি এ সময় সংঘটিত হয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে। অতঃপর
সেখান থেকে বোরাকে চড়ে অন্ধকার থাকতেই পবিত্র মক্কা শরীফ পৌঁছেন।
পবিত্র মি’রাজ শরীফ উনার আহকাম :
মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক
ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার اسراء ইস্রা معراج পবিত্র মি’রাজ শরীফ গমন সত্য ও নির্ভুল
এবং উনার সীমাহীন মর্যাদার প্রতীক। যার বর্ণনায় পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ
উনাদের অকাট্য দলীল বিদ্যমান। পবিত্র আক্বাইদ উনার কিতাবেও বলা হয়েছে, المعراج حق অর্থাৎ পবিত্র মি’রাজ শরীফ সত্য।
সুতরাং এটা বিশ্বাস করা প্রত্যেক মু’মিন মুসলমান পুরুষ-মহিলা, ছেলে-মেয়ে সবার জন্য ফরজ বা অবশ্য কর্তব্য এবং তা অস্বীকারকারী
ফাসেক ও কাফিরদের অন্তর্ভূক্ত।
ইমাম ইবনে কাসীর বলেন,
فحديث الاسراء اجمع عليه المسلمون واعرض عنه الزنادقة
والملحدون.
অর্থঃ- “পবিত্র মি’রাজ শরীফ সম্পর্কে
মুসলমানগণ উনাদের মধ্যে ঐক্যমত রয়েছে, শুধু ধর্মদ্রোহী যিন্দীকরা এটাকে বিশ্বাস করেনি।”


No comments