পবিত্র ইসলামী শরীয়ত উনার উসুল(পবিত্র ইজমা শরীফ)-৩
=========================================
শরীয়তের কোন বিষয়ের মীমাংসা বা ফায়সালা করতে হলে তা কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের দৃষ্টিতেই করতে হবে, এর বাইরে কোন কথা বা কাজ মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, শরীয়তের ভিত্তি বা দলীলই হলো উপরোক্ত চারটি। এ প্রসঙ্গে উসূলের কিতাবে উল্লেখ রয়েছে যে,
“মূলতঃ শরীয়তের ভিত্তি হলো তিনটি। কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা এবং চতুর্থ হলো- ক্বিয়াস।” (নুরুল আনোয়ার)
(ধারাবাহিক)
(৩) ইজমাঃ
------------
যে বিষয়ে কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফে স্পষ্ট কোন কিছু বলা হয়নি, সে বিষয়ে কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফ-এর দৃষ্টিতে ইজতিহাদ করতঃ হুকুম সাবিত করতে হবে। অবস্থার প্রেক্ষিতে ও প্রয়োজনীয়তায় এধরণের ইজতিহাদ করা আল্লাহ্ পাক ও রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এরই নির্দেশ।
যেমন- কালামে পাকে মহান আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,
فا عتبروا يا اولى الابصار
“হে চক্ষুস্মান ব্যক্তিগণ! তোমরা গবেষণা কর।”
আর সাইয়্যিদুল মুরসালিন, ইমামুল মুরসালিন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে ইয়েমেনের গভর্নর করে পাঠানোর প্রাক্কালে বলেছিলেন- “হে মুয়ায, তোমার নিকট কোন মুকাদ্দমা আসলে কিভাবে তা ফায়সালা করবে? হযরত মুয়ায রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, আল্লাহ্ পাক-এর কিতাবের দ্বারা। যদি ওটাতে না পাও তাহলে? আল্লাহ্ পাক-এর রসূলের সুন্নাহ্ দ্বারা। অতঃপর জিজ্ঞেস করলেন, যদি ওটাতেও না পাও তাহলে? আমি কিতাব ও সুন্নাহর ভিত্তিতে ইজতিহাদ করে রায় দেবো। এ উত্তর শুনে রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সমস্ত প্রশংসা ঐ আল্লাহ্ পাক-এর, যিনি তাঁর রসূলের দূতকে এ যোগ্যতা দান করেছেন, যাতে তাঁর রসূল সন্তুষ্ট হন।” (মিশকাত শরীফ)
এটা হতে স্পষ্ট প্রমাণিত হচ্ছে যে, মুসলমানদের কল্যানার্থে ও ইসলামী অনুশাসনে কুরআন সুন্নাহর অক্ষুন্নতার ক্ষেত্রে সমস্ত ইজতিহাদই অনুসরণ করা, অবস্থার ভিত্তিতে ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত।
আর উক্ত ইজতিহাদকৃত মাসয়ালার মধ্যে যেগুলোর উপর সকল মুজতাহীদগণ ঐক্যমত পোষণ করেছেন, শরীয়তে তাকেই ‘ইজমা’ বলা হয়। আর যে ইজতিহাদকৃত মাসয়ালা এককভাবে রয়েছে, সেটাকে বলা হয় ‘ক্বিয়াস’।
“ইজমা” শব্দের লোগাতী অর্থ হলো “ঐক্যমত”।
আর শরীয়তী বিধান অনুযায়ী ইজমার অর্থ হলো- “হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মতের সালেহ্ মুজতাহিদহণের একই সময়ে কোন কথা বা কাজের মধ্যে ঐক্যমত পোষণ করাই হলো ইজমা।” (নূরুল আনোয়ার ফি শরহিল মানার)
এটা হতে প্রমাণিত হলো যে, মুজতাহিদকে সালেহীনগণের অন্তর্ভূক্ত হতে হবে, আদেল হতে হবে, সুন্নতের পূর্ণ পাবন্দ হতে হবে, সগীরাহ্ গুণাহ হতেও বেঁচে থাকার চেষ্টা থাকতে হবে।
কোন বিদয়াতী ও হারাম কাজে লিপ্ত ব্যক্তির ইজতিহাদ গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন বর্তমানে অনেক উলামায়ে “ছূ” বা দুনিয়াদার তথাকথিত আলেমরা আধুনিকতার দোহাই দিয়ে অনেকে ছবি তোলার কাজে লিপ্ত, অথচ শরীয়তে ছবি তোলা সম্পূর্ণ হারাম। আর ইসলামী হুকুমত জারী করার দোহাই দিয়ে গণতন্ত্র ভিত্তিক আন্দোলনে জড়িত অথচ শরীয়তের দৃষ্টিতে গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পূর্ণই হারাম ও নাজায়েয। এ ধরণের কোন তথাকথিত আলেম বাহ্যিক দৃষ্টিতে যতই ইলমের দাবিদার হোক না কেন, সে যদি কোন শরঈ মাসয়ালার ইজতিহাদ করে, তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
ইজমার রোকনসমূহঃ
--------------------
ইজমার রোকন দু’টি। (১) আযীমত। (২) রোখসত।
(১) ইজমায়ে আযীমতের সংজ্ঞাঃ
------------------------------
ইজমায়ে আযীমত হলো- মুজতাহিদ ইজতিহাদ করার পর তাঁর যুগের কেউ যদি যে কথা বা কাজের উপর ইজতিহাদ করা হয়েছে সে বিষয়ে কোন দ্বিমত পোষণ না করে, অর্থাৎ সকলেই তা শরীয়তের হুকুম হিসেবে মেনে নেয়। যেমন- এটা বলে যে, আমরা সকলেই এটা মেনে নিলাম, অথবা ওটা যদি “ফে’লী” হয়, তাহলে সকলেই ঐ কাজ করতে শুরু করে দেয়। এ প্রকার ইজমার মধ্যে সর্বোত্তম ও সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী হলো হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণের ইজমা। এটার হুকুম কুরআন শরীফ-এর আয়াত ও মুতাওয়াতির হাদীস শরীফ-এর মতই হুজ্জত। কেউ যদি এ ধরণের ইজমাকে অর্থাৎ ইজমায়ে আযীমতকে অস্বীকার করে, তাহলে সে কাফের হয়ে যাবে। এটার উদাহরণ হলো, যেমন- হযরত আবু বকর সিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর খিলাফতের ব্যাপারে সমস্ত সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণের ইজমা এবং জুময়ার সানী আযান মসজিদের ভিতরে মিম্বরের সামনে দেওয়ার হুকুমের ব্যাপারে হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণের সর্ব সম্মতি রায় বা ইজমা।
(২) ইজমায়ে রোখসতের সংজ্ঞাঃ
------------------------------
ইজমায়ে রোখসত হলো- ইজতিহাদের বিষয় নিয়ে মুজতাহিদগণের মধ্যে ইখতিলাফ তথা মতানৈক্য হওয়া। হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণের কোন বিষয়ে ইমামগণের মধ্যে মতদ্বৈধতা সৃষ্টি হওয়া। কোন মুজতাহিদ কোন বিষয়ে মত প্রকাশের পর অন্য কোন মুজতাহিদ সে বিষয়ে ভিন্ন মত প্রকাশ করা বা না করা অথবা চুপ করে থাকা, এটাকে ইজমায়ে সুকুতীও বলা হয়। আমাদের নিকট ইজমায়ে রোখসত বা সুকুতী গ্রহণযোগ্য। হযরত ইমাম শাফেয়ী রহমতুল্লাহী আলাইহি এটার বিপরীত মত প্রকাশ করেছেন।
মূলতঃ ইজমা অস্বীকার করা, কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফ অস্বীকার করারই নামান্তর।
এ প্রসংগে আল্লাহ্ পাক বলেন,
و من يشاقق الرسول من بعد ماتبين له الهدى
و يتبع غير سبيل المز منين بوله ماتولى الخ
“যে কারো নিকট হিদায়েত বিকশিত হওয়ার পর, রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিরুদ্ধাচরণ করবে, আর মোমেনদের পথ থেকে ভিন্ন পথের অনুসরণ করবে, আমি তাকে সেদিকেই ফিরাবো, যেদিকে সে ফিরেছে।”
শায়খ আহমদ ইবনে আবূ সাঈদ মোল্লা জিয়ূন রহমতুল্লাহী আলাইহি এ আয়াত শরীফ-এর তাফসীরে উল্লেখ করেছেন- “এ আয়াত শরীফে মোমেনদের বিরোধীতাকে রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিরোধীতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
অতএব, রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস শরীফের মত তাদের ইজমাও অকাট্য ও প্রামান্য দলীল বলে পরিগণিত হবে।” (নুরুল আনোয়ার)
সাইয়্যিদুল মুরসালিন, ইমামুল মুরসালিন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সময়ে ইজমার প্রয়োজনীয়তা ছিলনা। ইজমার প্রচলন ও প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহ তায়ালা আনাহুগণের যুগে।
মহান আল্লাহ্ পাক বলেন-
كذالكجعلناكم
امة وسصا لتكنوا شهدا. على الناس.
“একইভাবে তোমাদেরকে আমি ন্যায়পরায়ণ (মধ্যস্ততাকারী) উম্মত হিসেবে সৃষ্টি করেছি, যাতে তোমরা (ক্বিয়ামত দিবসে) অন্যান্য উম্মতের সাক্ষী হতে পার।”
ইমাম ইবনুছ সালাহ্ রহমতুল্লাহী আলাইহি ‘মুকাদ্দিমায়ে ইবনুছ সালাহ্’ কিতাবে এবং মোল্লা জিয়ূন রহমতুল্লাহী আলাইহি ‘নুরুল আনোয়ার’ কিতাবে এটা দ্বারা হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণের ইজমা সাবেত করেছেন।
সুতরাং খোলাফা-ই-রাশেদীন অর্থাৎ হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণের উদ্ভাবিত কোন বিষয় অনুসরণ করা আমাদের জন্য সর্বতোভাবেই ওয়াজিব। যেমনিভাবে রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুসরণ করা ওয়াজিব। করণ হুযূরে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
فعليكم بسنتى وسنة خلفاء الرا شدين الهدين
“তোমরা আমার ও আমার হিদায়েতপ্রাপ্ত খোলাফা-ই-রাশেদীন-এর (উদ্ভাবিত) সুন্নাতকে আঁকড়িয়ে ধর।”
অনুরূপ হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণের পরবর্তী উম্মতে সালেহগণের ইজমাও হুজ্জত (শরীয়তের দলীল) যেমন- মাযহাব মানা ও মহিলাদের মসজিদে গিয়ে জামায়াতে নামাজ পড়া মাকরূহ্ তাহরীমী হওয়ার ব্যাপারে পরবর্তী উম্মতের ইজমা।
হাদীস শরীফে উল্লেখ রয়েছে যে, “আমার উম্মত কখনো গোমরাহীর মধ্যে একমত হবে না।” (মিশকাত শরীফ)
হাদীস শরীফে আরো ইরশাদ হয়েছে, “তোমরা বড় দলের অনুসরণ কর।” (মিশকাত শরীফ)
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা এটা অবশ্যই প্রমাণিত হয় যে, ইজমার অনুসরণ করা প্রত্যেকের জন্য অবশ্যই কর্তব্য। যে ব্যক্তি উক্ত ইজমাকে অস্বীকার করলো, সে কুফরী করলো।
এ প্রসঙ্গে কিতাবে উল্লেখ করা হয়-
فيكون الا جماع
حجة يكفر جاحده كالكتاب والسنة (تفسيراحمدى
“ইজমায়ে আযীমত কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফ-এর মতই একটি অকাট্য দলীল, যে ওটাকে অস্বীকার করলো, মূলতঃ সে কুফরী করলো।”
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, ইজমা শরীয়তের অকাট্য দলীল এবং তা অনুসরণ করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য অবশ্যই কর্তব্য।
(ইনশাআল্লাহ্ চলবে) পরবর্তি পোষ্ট শরীয়তের চতুর্থ উসূল “ক্বিয়াস”সম্পর্কে।


No comments